মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই শিশুর ফুসফুসের বিপজ্জনক টিউমার সংকুচিত করতে সক্ষম হয়েছেন চীনের চিকিৎসকেরা। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি। চিকিৎসকদের এই সাফল্য বিরল জন্মগত রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গর্ভস্থ শিশুটি ‘কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফরমেশন’ বা সিপিএএম (CPAM) নামের একটি বিরল জন্মগত ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিল। এ অবস্থায় ফুসফুসের ভেতরে অস্বাভাবিক টিস্যু তৈরি হয়, যা কিছু ক্ষেত্রে বড় হয়ে শিশুর স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের ত্রুটি গুরুতর হয় না। তবে টিউমার দ্রুত বড় হয়ে গেলে গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে গর্ভেই শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কীভাবে চিকিৎসা করা হলো?
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী আলট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪০ বছর বয়সী এক নারীর গর্ভে থাকা শিশুর টিউমারটি গর্ভধারণের ২২তম সপ্তাহে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার বড় হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে শিশুর হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পেটে বিপজ্জনকভাবে তরল জমেছিল।

শিশুটির ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকেরা মায়ের পেটের মধ্য দিয়ে একটি সরু সুই গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসের অস্বাভাবিক টিস্যুতে প্রবেশ করান। এরপর ওই সুইয়ের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয় মাইক্রোওয়েভ শক্তি।
এ প্রযুক্তিতে টিস্যুর ভেতরে তাপ তৈরি করে অস্বাভাবিক কোষ ধ্বংস করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ পদ্ধতি ‘মাইক্রোওয়েভ অ্যাবলেশন’ নামে পরিচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসার মাত্র তিন দিনের মধ্যে টিউমারটি উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে আসে। একই সঙ্গে শিশুর পেটে জমে থাকা তরলও পুরোপুরি সরে যায়।
প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সিপিএএমের চিকিৎসায় পরিস্থিতি অনুযায়ী স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। আবার টিউমারের মধ্যে বড় তরলপূর্ণ সিস্ট তৈরি হলে বিশেষ পদ্ধতিতে সেই তরল বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না।
আরেকটি বিকল্প হলো ‘ফিটাল লোবেক্টমি’, যেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসের আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয়। এটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া এবং মা ও শিশু—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সে তুলনায় মাইক্রোওয়েভ অ্যাবলেশন পদ্ধতিতে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়াই টিউমার সংকুচিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গর্ভস্থ শিশুর সিপিএএম চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে চিকিৎসকেরা নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
৩৭ সপ্তাহে জন্ম শিশুটির
চিকিৎসার পর গর্ভধারণের ৩৭তম সপ্তাহে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম।
এই ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, মাত্র একটি ঘটনার ভিত্তিতে নতুন পদ্ধতিটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতে আরও রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে যদি পদ্ধতিটি নিরাপদ, পুনরায় প্রয়োগযোগ্য ও কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে সিপিএএমের মতো জটিল জন্মগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।





