ব্রিটেনে বাংলা সাংবাদিকতার বিকাশ, গণমাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবদান এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ‘মিডিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন সুনামগঞ্জের সাংবাদিক, টেলিভিশন প্রযোজক ও রানার টিভির প্রতিষ্ঠাতা আ স ম মাসুম। চতুর্থ ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এর অনুষ্ঠানে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
বার্মিংহামের নিউ বিংলে হলে পাঁচ শতাধিক আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আ স ম মাসুমের হাতে সম্মাননা তুলে দেন বার্মিংহাম মেইল-এর সম্পাদক গ্রায়াম ব্রাউন।
অনুষ্ঠানে ব্যবসা, গণমাধ্যম, পেশাগত উৎকর্ষ ও কমিউনিটি সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২১ জন সফল ব্রিটিশ বাংলাদেশি ও অন্যান্য ব্রিটিশ ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্রিটেনের ১৫টি সফল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

আ স ম মাসুম আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, টেলিভিশন প্রযোজনা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবিক সংকট নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
প্রথম আলো থেকে ব্রিটেনের গণমাধ্যমে
২০০০ সালে দৈনিক প্রথম আলোয় লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। ২০০৩ সালে চ্যানেল এস বাংলাদেশে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন তিনি। পরের বছর পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটির সিলেট ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্ব পান।
২০০৬ সালে ব্রিটেনে এসে চ্যানেল এস ইউকেতে সিনিয়র প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন আ স ম মাসুম। সেখানে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘চ্যানেল এস স্টার’-এর সহপ্রযোজক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কাভার করেন। প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল বাংলা টিভির হেড অব প্রোগ্রাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

৬০টির বেশি দেশে মানবিক সংকটের খবর সংগ্রহ
সাংবাদিকতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমেও অবদান রেখেছেন আ স ম মাসুম। ২০১৫ সাল থেকে ইকরা টিভি ও আল খায়ের ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশ সফর করেছেন তিনি। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রম তুলে ধরেছেন ক্যামেরায়।
রানার টিভি প্রতিষ্ঠা ও ডিজিটাল সাংবাদিকতায় অবদান
ডিজিটাল সাংবাদিকতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ২০১২ সালে রানার টিভি প্রতিষ্ঠা করেন আ স ম মাসুম। ২০১৯ সালে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে এটিকে ব্রিটেনভিত্তিক বাংলা ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। ব্রিটেনের রাজনীতি, অভিবাসন, কমিউনিটির সমস্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রানার টিভির সংবাদ পরিবেশনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে।

সাংবাদিক সংগঠন ও কমিউনিটি সেবায় ভূমিকা
সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমেও ভূমিকা রেখেছেন আ স ম মাসুম। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে দীর্ঘ ১১ বছর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আজীবন সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি, নিজস্ব সম্পত্তি ক্রয়, স্থায়ী অফিস প্রতিষ্ঠা এবং গঠনতন্ত্র সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অবদান রাখেন।
সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশে-বিদেশে একাধিক সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে ‘ব্রিটিশ বাংলাদেশি পাওয়ার ১০০’ তালিকায় স্থান পান এবং একই বছর ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন থেকে আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সাংবাদিকতার মাধ্যমে অবদানের জন্য ক্যানারি ওয়ার্ফ গ্রুপের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
২০২৫ সালে রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে ‘সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক’ এবং দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে ‘সেরা মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার’ পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২৬ সালে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব তাঁকে ‘সেরা অনলাইন রিপোর্টার’ হিসেবে সম্মানিত করে।

প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম
পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আ স ম মাসুম। ২০০২ সালে পরিবেশ সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ নেন। ২০০৩ সালে চ্যানেল এস থেকে ছয় মাসের টেলিভিশন প্রযোজনা কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০০৪ সালে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, জাতীয় প্রেস ক্লাব ও খেলাঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০২২ সালে স্মার্ট ফিল্ম স্কুল থেকে মোবাইল সাংবাদিকতার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৬ সাল থেকে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।

গণমাধ্যমের বাইরে ব্রিটেনের স্বেচ্ছাসেবামূলক ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমেও সক্রিয় আ স ম মাসুম। তিনি ইস্টহ্যান্ডস চ্যারিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ব্রিটিশ বাংলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া পরিবেশ সচেতনতা ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, সিটি ব্রিজ ফাউন্ডেশন ও বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিলের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি।
সাংবাদিকতা, নতুন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা, সাংবাদিক সংগঠনের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রম ও সমাজসেবায় আড়াই দশকের বেশি সময়ের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মিডিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ আ স ম মাসুমের পেশাগত জীবনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে যুক্ত হলো। ব্রিটেনে বাংলা সাংবাদিকতার বিকাশ এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ পথচলার এই স্বীকৃতি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।






